আব্দুল আলিম শেখ ( শিক্ষক, ডোমকল কলেজ )
বর্তমান সভ্যতায় মানুষ অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত সুবিধা ভোগ করলেও মানসিকভাবে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবিরাম উপস্থিতি, কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাত্রা মানুষের মনকে এক ধরনের স্থায়ী অশান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক গুরু ওশো রজনীশের দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ওশোর দর্শনের মূল ভিত্তি কোনো জটিল শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা না হয়ে তাঁর দর্শন মূলত সচেতনতা, মৌনতা ও বর্তমানের প্রতিটি ক্ষণে বেঁচে থাকার এক অনন্য অভিপ্রায়। তাঁর জীবনদর্শনের নির্যাস হলো মানুষ যখন নিজেকে বাহ্যিক কোলাহল ও নিরন্তর মানসিক প্রতিক্রিয়া থেকে মুক্ত করে শান্ত করতে পারে, শুধুমাত্র তখনই জীবনের প্রকৃত সত্য তার নিকটে উন্মোচিত হয়।
সাধারণত শান্তি বলতে আমরা বাহ্যিক নীরবতাকে বুঝি। ওশোর মতানুযায়ী শান্তি শুধুমাত্র মুখ বন্ধ রাখা বা চুপচাপ বসে থাকা নয়। অনেক সময় একজন মানুষ বাইরে থেকে শান্ত থাকলেও তার মনের গভীরে চলতে থাকে নিরন্তর চিন্তার সংঘাত। ওশো মনে করেন প্রকৃত শান্তি হলো একটি গভীর অভ্যন্তরীণ অবস্থা। এই অবস্থায় মন পরিস্থিতির পেছনে উন্মত্তের মতো দৌড়ায় না। শান্ত ব্যক্তি পরিস্থিতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে বরং সবকিছুকে সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শেখেন। তাঁর মতে, নীরবতা হলো অন্তরের সেই অবস্থা যেখানে প্রতিটি কথা বা কাজ সচেতনতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়।
মানুষের অধিকাংশ মানসিক অশান্তির উৎস হলো অতীত ও ভবিষ্যৎ কালের ঘটনাসমূহ। মন কখনও ফেলে আসা দিনের স্মৃতিতে নিমগ্ন থেকে অনুশোচনা বা অপরাধবোধে ভোগে, আবার কখনও না আসা দিনের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকে। এই দুই বিপরীতমুখী চাপের ফলে মানুষের বর্তমান মুহূর্তগুলো নিষ্প্রভ হয়ে যায়। তিনি অস্তিরতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে সর্বদা বর্তমান সময়ে সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত থাকার নিদান দিয়েছেন। বর্তমান মুহূর্তে সম্পূর্ণ উপস্থিত থাকার অর্থ হলো মনের সব পথ বন্ধ করে দিয়ে বর্তমান মুহূর্তের আস্বাদ গ্রহণ করা। এই বর্তমানমুখিনতাই হলো শান্তির সূচনাবিন্দু।
আমাদের প্রতিদিনের জীবনে অশান্তির একটি বড় কারণ হলো পারিপার্শ্বিক প্রভাবে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো। কেউ কটু কথা বললে আমরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে পড়ি। ওশো এই অবস্থাকে অন্যের হাতের ক্রীড়নক হয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওশো বলেন, যদি অন্যের আচরণ ব্যক্তির মেজাজ নিয়ন্ত্রিত করে, তবে ঐ ব্যক্তির নিজের ওপর কোনো কর্তৃত্ব থাকে না। শান্ত থাকার অর্থ অন্যায় মেনে নেওয়া নয়, এটি হলো সচেতনভাবে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করা। উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে বলা সত্যও অনেক সময় হিতে বিপরীত হতে পারে; তবে শান্ত অবস্থায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য ওষুধের মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অহংকার হলো শান্তির পথে প্রধান অন্তরায়। অহংকার মানুষকে সর্বদা শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার লড়াইয়ে লিপ্ত রাখে। ওশোর মতে, কেউ আমাদের অপমান করলে প্রকৃতপক্ষে আমাদের ভেতরের সযত্নে লালিত প্রতিচ্ছবিটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আমাদের আত্মপরিচয় যখন অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন মনের মধ্যে অস্থিরতা দানা বাঁধে। ওশো বলেন, শান্তির লাভের জন্য যে উপলব্ধিটি প্রয়োজন সেটি হলো জগতের সব সমালোচনার উত্তর দেওয়া জরুরি নয়। তিনি বলেন, নিজের স্বরূপ সম্পর্কে সচেতন থাকলে বাইরের কোনো আক্রমণ মানসিক স্থিতিকে টলাতে পারে না।
ওশোর দর্শনের অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো ‘সাক্ষী ভাব’ বা নিরাসক্ত পর্যবেক্ষণ। যখন আমাদের মনে ক্রোধ বা দুঃখের উদয় হয়, আমরা সাধারণত সেই আবেগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই। কিন্তু ওশো বলেন ধ্যানের মাধ্যমে সেই আবেগকে দূরে দাঁড়িয়ে একজন দর্শকের মতো পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নিজের চিন্তা বা আবেগকে যখন কেউ সাক্ষী হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন সেই চিন্তাগুলো ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন হয়ে ওঠে। মন যখন সাক্ষীভাব লাভ করে, তখন এক ধরণের সৃজনশীল শক্তি মানুষের মনে জমা হতে শুরু করে।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ওশোর দর্শনের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। মানুষের পারস্পারিক সম্পর্কের জটিলতা মূলত অন্যকে নিজের মনের মতো করে ফেলার আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়। ওশো বললেন ভালোবাসার অর্থ নিয়ন্ত্রণ নয়, ভালোবাসা হলো অন্যকে তার স্বকীয়তায় গ্রহণ করা। আমরা সাধারণত অপর পক্ষের কথা শুনি শুধুমাত্র উত্তর দেওয়ার তাগিদে, বোঝার জন্য নয়। কিন্তু বিচারবুদ্ধিকে সরিয়ে রেখে যখন আমরা কাউকে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারি, তখন পারস্পরিক দূরত্বের অবসান ঘটে এবং সম্পর্কের মধ্যে এক অনাবিল শান্তি বিরাজ করে।
মানুষের মনোযোগ হলো তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ওশোর মতে মানুষের জীবন সেই দিকেই প্রবাহিত হয় যেদিকে মানুষের গভীর মনোযোগ থাকে। আমরা যদি সারাক্ষণ সমালোচনা, ঘৃণা বা নেতিবাচক চর্চায় মগ্ন থাকি, তবে আমাদের জীবন বিষণ্ণতায় ভরে ওঠবে। নেতিবাচক চর্চার পরিবর্তে আমরা যদি নিজেদের উন্নতি ও সৃজনশীলতার দিকে গুরুত্ব দিই, তবে জীবন পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাবে। প্রতিদিনের তুচ্ছ বিবাদ বা অপ্রয়োজনীয় সামাজিক যোগাযোগের ভিড়ে আমরা আমাদের সৃজনশীল সম্পদটি অপচয় করি।
পরিশেষে ওশো এক পরম শূন্যতার কথা বলেন। শূন্যতা হলো অহংকারহীন অবস্থা। যখন কোনো ব্যক্তি আমিত্বহীন হয়ে ওঠে, তখন সে নিজেকে মহাবিশ্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনুভব করবে। এই বিশেষ অবস্থায় মৌনতা একপ্রকার অপূর্ব সংগীতে রূপ নেবে। জীবনের প্রকৃত সুর খুঁজে পাওয়ার জন্য বাহ্যিক কোলাহলের পাশাপাশি নিজের অন্তরের নীরবতার দিকেও দৃষ্টি ফেরানো জরুরি। এরজন্য প্রতিদিন কিছুটা সময় নিজের সঙ্গে নিরিবিলিতে কাটানো প্রয়োজন। নিরিবিলিতে নিজের স্বরূপকে জানার চেষ্টা করতে হবে। তাহলে জীবন হয়ে উঠবে শান্তিময়। জীবন তখন হয়ে ওঠবে এক সুরময় যাত্রা। জীবনের এই সুরময় যাত্রা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ ভবিষ্যতের পথ দেখাতে পারে।
