একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতা আজ এমন এক অভূতপূর্ব দ্বন্দ্বের মুখোমুখি, যেখানে নিজস্ব উদ্ভাবিত প্রযুক্তিই মানুষের স্বাভাবিক বিকাশ ও মননশীলতার প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করেছিল নিজের সুবিধার্থে, সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবে, আজ তা-ই ক্রমান্বয়ে মানুষকে স্বকীয় সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। সাম্প্রতিককালে শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে রাজ্য সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক স্তর থেকে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা নিছক একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকা মাত্র নয়; বরং এটি বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় একটি অতি জরুরি কালোপযোগী পদক্ষেপ। স্বপনকুমার মণ্ডলের মূল ভাবনার সূত্র ধরে যদি আমরা এই সংকটটিকে গভীর ও গবেষণাধর্মী দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে যে এই পদক্ষেপর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং শিক্ষাদর্শের এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
মোবাইল ফোনের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালের ৪ এপ্রিল যখন এই যন্ত্রটির উদ্ভাবক মার্টিন কুপার প্রথম তারবিহীন ফোনের মাধ্যমে বার্তা পাঠালেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের বার্তা আদান-প্রদানকে ভৌগোলিক সীমার ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু আজকের আধুনিক স্মার্টফোন সেই প্রাথমিক উদ্দেশ্যকে অতিক্রম করে এক বিশাল ভার্চুয়াল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। ৯০ বছর বয়সে পৌঁছে মার্টিন কুপার নিজেই আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেছেন, বর্তমান প্রজন্ম যেভাবে দৈনিক পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে মোবাইলের ডিসপ্লেতে নিজেদের চোখ আটকে রাখছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, বাস্তব জীবনকে পেছনে ফেলে এই ধরনের স্ক্রিন-নির্ভরতা তরুণ সমাজকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ করে দিচ্ছে। যে উদ্ভাবক মানুষের সংযোগ সহজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁকেই আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে নিজের সৃষ্টির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সামাজিক বিষময় ফল প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যত উন্নত হয়েছে, মানুষের নিঃসঙ্গতা দূর করার অজুহাতে তত বেশি তৈরি হয়েছে যোগাযোগের কৃত্রিম মাধ্যম। মার্ক জুকারবার্গ যখন ফেসবুক বা তার পরবর্তী সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করেন, তখন দাবি করা হয়েছিল পৃথিবীর মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলার কথা। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন এক নিষ্ঠুর সত্য। ভার্চুয়াল পৃথিবীর এই অনবরত তথ্য ও ছবির বন্যা মানুষকে প্রকৃত অর্থে কাছাকাছি না এনে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলছে। সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে মানুষের জীবনের বাস্তব জটিলতা, শ্রম কিংবা সত্যের উপস্থিতি থাকে না; সেখানে কেবল থাকে কৃত্রিম সৌন্দর্য, পরিশীলিত রূপ এবং ক্ষণিকের কৌতূহল। তরুণ প্রজন্ম যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই অবাস্তব দুনিয়ায় নিজেদের সঁপে দেয়, তখন মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামক রাসায়নিকের এক ক্ষতিকর নিঃসরন চক্র তৈরি হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় এক গভীর আসক্তি, যা ক্রমশ বাস্তব সমাজ ও মানুষের সান্নিধ্য থেকে ছাত্রছাত্রীদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।
কৈশোর ও উদীয়মান যৌবন হলো মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের মূল সময়। এই সময়ে মস্তিষ্কের যে অংশগুলো মনোযোগ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বোঝাপড়ার জন্য দায়ী, সেগুলো দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। কিন্তু স্মার্টফোনের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি এই স্বাভাবিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক, কমেন্ট ও রিঅ্যাকশনের সংখ্যা দিয়ে নিজের যোগ্যতা মাপার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এর ফলশ্রুতি হিসেবে উদ্ভব ঘটেছে ‘ফোমো’ বা ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’-এর মতো মানসিক ব্যাধির। সহপাঠী বা পরিচিত কেউ কোথায় গেল, কী খেল বা কীভাবে ছুটির দিন কাটাল—তা অবিরত দেখতে দেখতে কিশোর মন নিজের জীবন সম্পর্কে এক ধরনের হীনমন্যতা ও হতাশায় ভুগতে শুরু করে। রিলস বা শর্ট ভিডিওর অনবরত স্ক্রোলিং তরুণদের মনোযোগের সময়সীমা এতটাই কমিয়ে দিচ্ছে যে, দীর্ঘক্ষণ কোনো বিষয় গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়া বা চিন্তা করার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলছে।
অনলাইন শিক্ষার প্রাক্কালে বা করোনাকালের অতিমারিতে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল, তখন পড়াশোনার প্রয়োজনেই বাধ্য হয়ে শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিতে হয়েছিল। কিন্তু অতিমারি কেটে যাওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, সেই আপৎকালীন শিক্ষা মাধ্যমটিই আজ শৈশবের প্রধান প্রধান ক্ষেত্রগুলোকে গ্রাস করে নিয়েছে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের সরাসরি বক্তব্য শোনার চেয়ে, খেলার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে শারীরিক কসরত করার চেয়ে কিংবা কোনো সাহিত্য পাঠের আনন্দে ডুবে থাকার চেয়ে ছাত্রছাত্রীদের কাছে অনেক বেশি প্রলোভনময় হয়ে উঠেছে হাতের মুঠোয় থাকা ছোট পর্দাটি। এর ফলে কেবল তাদের চোখের দৃষ্টি বা শারীরিক শক্তি কমছে না, বরং ক্ষুণ্ন হচ্ছে তাদের মৌলিক চিন্তাশক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং পারস্পরিক সহানুভূতির অনুভূতি। সহপাঠীর সঙ্গে মুখোমুখি কথা বলে যে আবেগ ও সম্পর্কের বুনন তৈরি হয়, কোনো চ্যাটবক্স বা ইমোজি তা ফিরিয়ে দিতে পারে না।
বিদ্যালয় হলো কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র নয়; এটি এমন একটি সামাজিক প্রাঙ্গণ যেখানে শিশুরা শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সহমর্মিতা, নেতৃত্ব ও সহযোগিতার পাঠ গ্রহণ করে। যখন সেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই মোবাইলের উপস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তখন শিক্ষালয়ের সেই মূল উদ্দেশ্যই বিনষ্ট হয়। শ্রেণীকক্ষে মোবাইল ফোনের গোপন ব্যবহার শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার প্রথাগত ও পবিত্র যোগাযোগকে শিথিল করে দেয়। টিফিনের সময় যেখানে খেলার মাঠে ছুটাছুটি ও কোলাহল থাকার কথা, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের গোল হয়ে বসে যার যার মোবাইলের পর্দায় মুখ গুঁজে থাকার দৃশ্য এক বিপজ্জনক সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রেক্ষাপটে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নেওয়া কঠোর ও সতর্কতামূলক সিদ্ধান্তটি কোনো ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হরণের প্রয়াস নয়; বরং এটি শৈশবকে স্ক্রিনের বিষাক্ত আসক্তি থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনার এক অত্যন্ত দূরদর্শী রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গীকার।
প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে কেবল নিষেধাজ্ঞা জারি করাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে থাকা সমাজমনস্তাত্ত্বিক দিকটি বুঝে গঠনমূলক বিকল্প গড়ে তোলা প্রয়োজন। যখন একজন শিশু গৃহপরিবেশ বা সামাজিক জীবনে একাকীত্ব বোধ করে, তখনই সে অবচেতনভাবে স্মার্টফোনের কৃত্রিম আনন্দকে আঁকড়ে ধরে। আজকের নিউক্লিয়ার পরিবারগুলোতে অভিভাবকরা প্রায়শই নিজেদের ব্যস্ততার কারণে বা সন্তানকে সাময়িকভাবে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে শৈশব থেকেই তাদের হাতে মোবাইল তুলে দেন। এই অভ্যাসই পরবর্তীকালে এক অদম্য আসক্তিতে রূপ নেয়। সুতরাং, মোবাইল নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক পরিকাঠামোরও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। ঘরোয়া আলাপ-আলোচনা, বই পড়ার পাঠভ্যাস ফিরিয়ে আনা এবং শারীরিক খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি না করলে কেবল আইনি বা শাসনতান্ত্রিক নিগড়ে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশেও আজ মোবাইল মুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসকল বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানকার শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক পারফরম্যান্স, মনোযোগের মাত্রা এবং মানসিক প্রশান্তি অন্যান্যদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোবাইল ফোন যদি বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ হয়, তবে তার অনিয়ন্ত্রিত ও সময়োপযোগী ব্যবহারের অভাব সেই আশীর্বাদকেই অভিশাপে পরিণত করতে পারে। ‘আউট অব সাইট, আউট অব মাইন্ড’—এই আপ্তবাক্যটি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রযোজ্য। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মোবাইল যদি তাদের চোখের সামনে না থাকে, তবে তারা তাদের সম্পূর্ণ শক্তি ও চিন্তাশক্তি পড়াশোনা, সহপাঠীদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন এবং নিজস্ব মেধা বিকাশে নিয়োজিত করতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, মোবাইল রূপ বিষ থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করার এই লড়াই কেবল রাজ্য সরকার বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একা নয়; এটি পুরো সমাজ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের যৌথ দায়িত্ব। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তির দাসত্ব করার জন্য মানুষের জন্ম হয়নি, বরং প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। একটি শিশুর কচি মনে যেন ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম আলো বাস্তব পৃথিবীর স্বাভাবিক সূর্যালোকে ঢেকে না ফেলে, তা নিশ্চিত করাই আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশিকা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রগ্রেসিভ পদক্ষেপ। এই সিদ্ধান্তের যথাযোগ্য বাস্তবায়ন এবং পারিবারিক স্তরে সজ্ঞান সচেতনতাই পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও মেধাভিত্তিক সুন্দর সকাল উপহার দিতে।
